শিরোনাম
নির্বাচনে নিজের পরাজয় স্বীকার না করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য নির্বাচিত এই প্রেসিডেন্ট গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো কিছুই ক্ষমতা হস্তান্তরকে থামিয়ে রাখতে পারবে না।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে টুইট করে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই জয় পাবেন। প্রতি চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম যেভাবে নির্বাচনে কে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন তা তুলে ধরে সেভাবে এবারো দেশটির সব প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ট্রাম্পের পরাজয়ের বিষয়ে পূর্বাভাস দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন, এ বিষয়ে তিনি কী ভাবছেন, মঙ্গলবার ডেলওয়ারের উইলমিংটনে একজন সাংবাদিক বাইডেনকে এ প্রশ্ন করেন। উত্তরে বাইডেন বলেন, ‘খোলাখুলি বললে, এটিকে আমি বিব্রতকর বলে মনে করি। এটি প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারকে সাহায্য করবে না। ২০ জানুয়ারি এসব শেষ হবে।’ ২০ জানুয়ারি, ২০২১ যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের অভিষেক হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজ্য পর্যায়ের ফল সরকারিভাবে ঘোষিত হয়নি, বেশ কয়েকটি জায়গায় ভোট গণনা এখনো চলছে। এই রাজ্যগুলোর ফল নির্ধারিত হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকটোরাল কলেজের বৈঠকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষিত হবে।
হোয়াইট হাউজের ওভাল দফতরের দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকা বাইডেনকে বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর নেতারা ফোন করে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। মঙ্গলবার তিনি যাদের সাথে কথা বলেছেন তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিকেল মার্টিন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল অন্যতম। এ প্রসঙ্গে বাইডেন বলেছেন, ‘আমি তাদের জানিয়েছি, আমেরিকা ফিরে আসছে। আমরা আবার খেলায় ফিরে আসছি।’
এ দিকে রয়টার্স/ইসপোস পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুললেও যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষ এটি বিশ্বাস করে না। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮০ ভাগই বাইডেনকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এই ৮০ ভাগের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক।
২০ জানুয়ারি সম্ভাব্য শপথ গ্রহণের পর নিজ প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকা নিয়ে এই মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাইডেন। অন্য দিকে বাইডেনের এই ঘোষিত বিজয়কে উল্টে দিতে বড় ধরনের কোনো প্রমাণ ছাড়াই নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলছেন ট্রাম্প। ভোট গ্রহণ ও ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগ এনে এরই মধ্যে ট্রাম্প শিবিরের পক্ষ থেকে ডজনখানেক মামলা করা হয়েছে।
বাইডেন সবার আগে করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলার ওপর জোর দিচ্ছেন। এ ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে দুই লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাইডেন বলছেন, এ বছর ২৬ নভেম্বর থ্যাংকস গিভিং ডের ছুটির আগেই তিনি গোটা দুয়েক গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন দেবেন।
তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে বাইডেনের প্রতিনিধিদের সাথে কোনো সহযোগিতা করছে না ট্রাম্প প্রশাসন। এখন পর্যন্ত বাইডেনের বিজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। নিয়ম অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেয়ার কথা। এর আগেই বিদায়ী ও আসন্ন প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি সেরে নিতে হয়। তবে ট্রাম্প এখনো হার মেনে না নেয়ায় সেই সমন্বয়ের প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। সোমবার বাইডেন শিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে এখন আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছেন তারা।
বিদায়ী ও আসন্ন প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি করে থাকে জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিএসএ)। তারাই পুরনো প্রশাসনের কাছ থেকে নুতন প্রশাসনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার কাজটি করে থাকে। এখন এই জিএসএর বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা করছে বাইডেন শিবির। জিএসএ কখন সরকার বদলের এ প্রক্রিয়া শুরু করবে সে ব্যাপারে আইনে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। তবে বাইডেন শিবির বলছে, তাদের বিজয় পরিষ্কার। ফলে এখানে বিলম্ব বা কালক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ নেই।
পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগ : মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জেমস অ্যান্ডারসন পদত্যাগ করেছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা দফতরের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন অ্যান্ডারসন।
অ্যান্ডারসন নিজ থেকেই পদত্যাগ করেছেন নাকি তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে মার্ক এসপারকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরখাস্ত করার পরদিনই অ্যান্ডারসন পদত্যাগ করলেন। একই দিনে দেশটির বিচার বিভাগের নির্বাচনসংক্রান্ত অপরাধবিষয়ক শীর্ষ আইনজীবী রিচার্ড পিলগারও পদত্যাগ করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কথিত ভোট জালিয়াতি তদন্তের আদেশ দিলে প্রতিবাদে পিলগার পদত্যাগ করেন। প্রতিরক্ষা দফতরের পলিসি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন আন্ডারসন। তিনি জন রডের স্থলে এই দায়িত্বে ছিলেন। জন রডকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বরখাস্ত করেন ট্রাম্প। বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে বিস্তর মতপার্থক্যের জেরে তিনি বরখাস্ত হন। ২০১৮ সাল থেকে পেন্টাগনে ছিলেন অ্যান্ডারসন। তিনি শুরু করেছিলেন স্ট্র্যাটেজি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে। পরে পলিসি বিভাগের ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি হন। রড বরখাস্ত হলে সেই দায়িত্ব এসে পড়ে অ্যান্ডারসনের ওপর।
গত সোমবার টুইট করে এসপারকে বরখাস্তের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের প্রধান ক্রিস্টোফার মিলার তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও এসপারের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। এই বিরোধের জেরেই এসপার বরখাস্ত হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে ডেমোক্র্যাট শিবির। এসপারের আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন জেমস ম্যাটিস। সিরিয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধের জেরে তিনি ২০১৮ সালে পদত্যাগ করেন। ট্রাম্প তার চার বছরের মেয়াদকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও উপদেষ্টাকে বরখাস্ত করেছেন। তার প্রশাসনের অনেকে পদত্যাগ করেছেন বা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।
সদ্যসমাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প তার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিপক্ষ জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হয়েছেন। তবে তিনি এখন পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।