শিরোনাম
দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। গতকাল সোমবার আগের ৭০ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বিপজ্জনক এই ভাইরাসটিতে। গতকাল সারা দেশে দুই হাজার ১৩৯ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর দুই হাজার ২০২ জন করোনায় শনাক্ত হয়েছিল। সংক্রমণ বাড়ার পেছনে দেশব্যাপী স্বাস্থ্যবিধি মানায় শিথিলতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তারা বলছেন, করোনা নতুন করে বাড়ার পেছনে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানতে শৈথিল্য দেখানোই মূল কারণ। সরকারি পর্যায় থেকেও স্বাস্থ্যবিধি মানাতেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, গত জুন, জুলাই অথবা আগস্ট মাসের মতো আতঙ্কজনক সংক্রমণের হার এখন নেই। তবে আগামী শীতে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ (দ্বিতীয় ঢেউ) শুরু হলে সংক্রমণ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। অবশ্য বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এখনো শুরু হয়নি। এখনো প্রথম সংক্রমণের পর্যায়ই চলছে।
গতকাল সারা দেশের ২১৬ আরটিপিসিআর মেশিনে ১৫ হাজার ৭৬৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তা থেকে করোনা শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ১৩৯ জন। গতকাল করোনা আক্রান্ত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সারা দেশে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা মোট নমুনা পরীক্ষার ১৬.৯৯ শতাংশ হলেও গতকাল করোনা সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ১৩.৫৭ শতাংশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশে মোট শনাক্তের ১.৪৩ শতাংশ মৃত্যবরণ করেছে।
চলতি বছরের ৮ মার্চের পর থেকে গত ২৫৪ দিনে চার লাখ ৪০ হাজার ৪৭২ জন করোনা সংক্রমণের শিকার হলেও গতকাল পর্যন্ত তিন লাখ ৫১ হাজার ১৪৬ জন সুস্থ হয়েছেন। দেশে ৮০.৮২ শতাংশ সুস্থ হওয়ার সংখ্যা। অবশিষ্টরা এখনো হাসপাতালে ও বাড়িতে চিকিৎসাধীন, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিনে আছে।
সংক্রমণ বাড়ার ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: এম মোজাহেরুল হক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, মূলত স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে না মানার কারণেই নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। মাঝখানে সংক্রমণের হার কমে সাড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে ধীরে ধীরে সংক্রমণের বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ১৩.৫৭ শতাংশে।
তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, এটা হয়তো হতো না যদি সরকার স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কঠোর হতে পারত। স্বাস্থ্যবিধিতে তো নানা ধরনের শাস্তির কথা রয়েছে। করোনা সংক্রমণ কমাতে জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে সরকারের উচিৎ কঠোরতা অবলম্বন করা। তিনি বলেন, বাইরে বেল হলে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করা, কোনো কিছু ধরলে অবশ্যই হাত ধোয়া এবং একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত দূরত্ব বজায় রাখার যে আইন তা মানতে বাধ্য করাতে পারলেই সংক্রমণ অনেক কমে যেত।
ডা: এম মোজাহেরুল হক বলেন, আর যেন করোনা সংক্রমণ না বাড়ে সে জন্য সরকারের উচিত আজ থেকেই স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানার ব্যাপারে কঠোর হওয়া।
এ দিকে করোনা শনাক্তের সংখ্যা আগের মতো আতঙ্কজনক না হলেও সরকারি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) সিটের হাহাকার চলছে। তবে বেসরকারি তারকা হাসপাতালের আইসিইউ সিট সংখ্যা কিন্তু অর্ধেকেরও বেশি খালি রয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে কোভিড ডেডিকেটেড (করোনার চিকিৎসা হয় যেসব হাসপাতাল) ১৯ হাসপাতালে মোট ৩০৯টি আইসিইউ বেড রয়েছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত আইসিইউতে ২০২ জন করোনার রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১০৭টি আইসিইউ সিট খালি ছিল বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে। তবে এই ১৯ হাসপাতালে তিন হাজার ৫১৯টি সাধারণ সিট রয়েছে চিকিৎসার জন্য। এর মধ্যে এক হাজার ৯৩৯টি সিটে রোগী ভর্তি ছিল। সাধারণ বেডের এক হাজার ৫৮০টি সিট খালি ছিল। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ১০টি হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালের ৭৭০টি সাধারণ বেড রয়েছে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছে ১৪৯টিতে, খালি রয়েছে ৬২১টি। এই ১০ হাসপাতালের আইসিইউ বেড রয়েছে ৩৯টি। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত খালি রয়েছে ২৫টি।
কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল সম্পর্কে রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর জানিয়েছেন, কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন যেসব ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছিল এর সবই রয়েছে। রোগী ছিল না বলে কোনো কোনো হাসপাতালের কার্যক্রম ছিল না। আবার যদি করোনা সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ে তাহলে সে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাকার্যক্রম আবার চালু করা হবে। কোনো হাসপাতালই সরকার ছেড়ে দেয়নি।
২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৬০৪ জন : অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা: নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত রোববারের চেয়ে গতকাল সোমবার শনাক্তের হার দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ছিল। দেশে এ পর্যন্ত মোট ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। করোনায় গতকাল পর্যন্ত দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন ছয় হাজার ২১৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, ‘করোনাভাইরাস শনাক্তে গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৬ হাজার ২১৮ জনের। আগের দিন সংগ্রহ করা হয়েছিল ১৪ হাজার ৩ জনের। গতকালের চেয়ে ২ হাজার ২১৬টি নমুনা বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আগের দিনের চেয়ে এক হাজার ৭০৮টি বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি ১০ লাখে এ পর্যন্ত শনাক্ত দুই হাজার ৫৫১ দশমিক ১২ জন। সুস্থ হয়েছেন প্রতি ১০ লাখে এ পর্যন্ত দুই হাজার ৬১ দশমিক ৮৫ জন এবং প্রতি ১০ লাখে মারা গেছেন এ পর্যন্ত ৩৬ দশমিক ৪৯ জন। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারী ২১ জনের মধ্যে পুরুষ ১৬ জন, আর নারী ছয়জন। এ পর্যন্ত পুরুষ মৃত্যুবরণ করেছেন ৪ হাজার ৭৮৩ জন, আর নারী মৃত্যুবরণ করেছেন ১ হাজার ৪৩২ জন। শতকরা হিসাবে পুরুষ ৭৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ; নারী ২৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২৪ ঘণ্টায় ২০ জন হাসপাতালে এবং ১ জন বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেছেন।
চট্টগ্রামেও করোনাভাইরাসে সাড়ে চার মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৮১ জন সংক্রমিত হয়েছে এবং সংক্রমণের হার ১৭.১৪ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে গতকাল করোনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ বিভাগে এ পর্যন্ত ৩২৫ জন মৃত্যুবরণ করেছে। এ বিভাগে মোট ২১ হাজার ৭৫০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।
প্রমিজ নিউজ/ছানাউল্লাহ মাহমুদ