শিরোনাম
স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৯ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরি গ্রামের মরহুম বদরুজ্জমানের ছেলে ৭০ বছরের বয়োবৃদ্ধ বার্ধক্যাক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসম মনছুরীর । ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন দপ্তরের দরজায়-দরজায় ঘুরেও তালিকাভুক্ত হতে না পেরে বর্তমানে নানা বার্ধক্য রোগেও মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তিনি।
একান্ত আলাপকালে হাসেম মনছুরী আবেগ জনিত কন্ঠে জানান, এসএসসি পাস করার পর পরিবারের হাল ধরতে ছোটখাট ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল তখন ব্যবসায়ীক কাজে তিনি খুলনায় ছিলেন। পাকিস্তানী বাহিনী সারা দেশে অত্যাচার-নির্যাতন, বাড়ী-ঘরে আগুন, নারী ধর্ষণসহ হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে তাঁরা ব্যবসায়ীক খুলনায় অবস্থানরত নরসিংদি জেলার ইউসুফ,খুলনা জেলার হারুনসহ ৭ বন্ধু সিদ্ধান্ত নিল দেশকে শুক্রুদের হাত থেকে মুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবেন। ৭ বন্ধু মিলে ফেনী জেলার বড়ার পার হয়ে ভারতের হরিনা ক্যাম্পে প্রায় ৯০ জনের একটি দল নিয়ে ১৪ দিনের ট্রেনিং গ্রহণ করেন। এর পর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ১০ জনকে ভারতের দেরাধুম নিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ঢাকা কমলাপুরে আনা হয়।
হাসেম মনছুরী বলেন, চাঁন্দপুরের কচুয়া থানা রহিমা নগরে পাকিস্তানী বাহিনী শক্ত ঘাটি করে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় বাড়ী-ঘরে হামলা, আগুন,নির্যাতন করেই যাচ্ছে। তখন আমরা ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মোস্তাফিজুর রহমানের অধিনে ঢাকা কমলা পুরে অবস্থান করছিলাম। পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতনের বিষয়টি মুক্তি বাহিনীর হাইকমান্ডের নজরে আসলে ১৩ জুন চান্দপুরের মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডার হানিফের নেতৃত্বে আমরা ৭ জনকে চাঁন্দপুর কচুয়া থানা রহিমা নগর অপারেশনের জন্য পাঠানো হয়। আমরা রাতে ঢাকা থেকে চান্দপুর রহিমা নগর হাইস্কুলে অবস্থান নিয়। পরের দিন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হাবিবুর রহমান আমাদেরকে রাতে খাবারের দাওয়াত দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে আমাদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। তখন পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে আমাদের মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে আমাদের ৫ সহ কর্মী শহীদ হন। আমাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়। কমলা পুরের চিটাগাং হোটেলের মালিক আমাকে হোটেল কর্মচারী পরিচয় দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করায়। সুস্থ্য হয়ে ১ মাস পর মাকে দেখতে বাড়ী এসে আনোয়ারা উপজেলার গুয়াপঞ্জক গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা কাজী আবদুল হকের সাথে পটিয়া ও চট্টগ্রাম নগরে ২ টি অপারেশন করেছি। এ অপারেশনে আমার সাথে আনোয়ারা কাজী আবদুল হক,বোয়ালখালীর মনছুর,পটিয়ার আবদুস সালাম ও হুলাইন এলাকার নুরুন্নবীও ছিলেন। পরে কাজী আবদুল হক আমাকে কর্ণফুলীর পুরাতণ ফেরিঘাট এলাকায় ক্যাপ্টেন করিমের সাথে যুক্ত করে দেয়। আমাদের অনেক সহপাঠি শহীদ হয়েছেন, আমাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন,দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল আতাউল গণী ওসমানী স্বাক্ষরিত আমাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ পত্র দেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ টি বছর পেরিয়ে গেলেও বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি।
হাসেম মনছুরী আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করতে ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম মুক্তযুদ্ধ সংসদে আবেদন করতে গেলে সেখানে টাকা চাইলে ঢাকা গিয়ে আবেদন করেছি। সেই তালিকায় নাম না আসলে ২০১৪ সালে ওসমানী সনদ, উপজেলা কমান্ডারের প্রত্যয়ন পত্র, যুদ্ধকালীন কমান্ডারের প্রত্যয়ন পত্র ও ৩ জন সহযোদ্ধার প্রত্যয়ন পত্রসহ আবারো আবেদন করেছি। কিন্তু সেই আবেদনে কিছু টাকা দিলেও সংশ্লিষ্টদের চাহিদামত টাকা দিতে না পারায় আমার নাম অর্ন্তভুক্ত হয়নি।
আনোয়ারা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা জাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য আবদুল মান্নান জানান, হাসেম মনছুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। পূর্বে যদি কোন কারণে বাদ পড়ে থাকে তাহলে জানুয়ারীতে তালিকা সংশোধন করার সময় আবেদন করতে পারবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যদি কোন কারণে সরকারি তালিকা থেকে বাদ পড়ে থাকে এটা দুঃখ জনক। আনোয়ারায় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাচাই কমিটি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা রয়েছে। এ মামলা নিস্পত্তি হলে তালিকা সংশোধনের সময় আবেদন করলে বিষটি দেখা হবে।