শিরোনাম
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার গৃহীত চার প্রকল্পে ১৯১ কোটি টাকার মতো দুর্নীতি ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প বাজেটের শতকরা হিসাবে এই আর্থিক ক্ষতি বা দুর্নীতির হার ছিলো সর্বনিম্ন ১৪.৩৬ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৭৬.৯২ ভাগ পর্যন্ত বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিদ্যমান সুশাসনের ঘাটতির কারণে এখনো বছরে জাতীয় আয়ের প্রায় ২.২ শতাংশ বা গড়ে ৩.২ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা এবং নদী ভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূল অঞ্চলের ৩ কোটি ৫০ লাখ এবং চরাঞ্চলে ৬৫ লাখ মানুষ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আমফানসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ সাড়াদান কার্যক্রমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, জাতীয় আইন, নীতি-আদেশ কার্যকরে ‘ঘাটতি’ ছিল বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় : ঘূর্ণিঝড় আমফানসহ সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার এসব তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সংস্থাটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ববক্তব্য রাখেন। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন ইউনিটের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো: নেওয়াজুল মওলা এবং জলবায়ু অর্থায়নে পলিসি ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার কাজী আবু সালেহ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পূর্বে সংঘটিত দুর্যোগসহ সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় আমফান মোকাবেলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো দুর্গম এলাকায় দুর্যোগের পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও সতর্কতামূলক বার্তা প্রচারসহ আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে হট লাইনের নম্বর প্রচার করা হয় নি। স্থানীয়ভাবে ত্রাণ ও সুবিধাভোগীর তালিকা এবং মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভাগ ও জেলা ভিত্তিক তদারকি প্রতিবেদন করার দায়িত্ব থাকলেও এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়নি।
জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো চিহ্নিত করা, দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো মেরামত এবং প্রকৃত ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে যেমন ঘাটতি ছিলো, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় তহবিল বরাদ্দের কারণে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহে কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নিয়মিত মেরামতের ঘাটতির করণে বাঁধের মোট ৮৪টি পয়েন্ট ভাঙ্গাসহ ২৩৩ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা মেরামতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে দুর্গত এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি আমফান আঘাত হানার ছয় মাস পরেও সাতক্ষীরার আশাশুনিতে বাঁধ সংস্কার না করায় ঘর-বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ গৃহহীন থেকেছে।
এছাড়া দুর্যোগ বিষয়ক মহড়ার আয়োজন, যথাযথভাবে ত্রাণের চাহিদা নিরূপণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী শনাক্ত ও নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিলো। জমির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়-ক্ষতি বিবেচনায় না নেওয়ায় শুধুমাত্র উপক‚লীয় জেলাগুলোতে ঘূর্র্ণিঝড় আমফান পরবর্তী প্রথম বছরান্তে কৃষিতে প্রাক্কলিত ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় ২,০৩৫ কোটি টাকা এবং আগামী দুই থেকে তিন বছর প্রায় ৬১ হাজার ৬০২ হেক্টর জমি ব্যবহার অনুপযোগী থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় জনপ্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতির ফলে দুর্গম এলাকায় যথাসময়ে ত্রাণ না পৌঁছানো। একই সুবিধাভোগীর একাধিকবার ত্রাণ পাওয়াসহ বিবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। যেমন, দুর্যোগ সহনশীল বাঁধ, রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে যেমন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে তেমনি আশ্রয়কেন্দ্র/বাঁধ নির্মাণে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার ও ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ত্রাণ বিতরণে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার উদাহরণও এই গবেষণায় উঠে এসেছে।
উল্লেখ্য, উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত ৪টি প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে ০.২৬ থেকে ১৪০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প বাজেটের শতকরা হিসেবে এই আর্থিক ক্ষতির হার ছিলো সর্বনিম্ন ১৪.৩৬ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৭৬.৯২ ভাগ পর্যন্ত।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে পোল্ডার নির্মাণ, মনু নদী সেচ ও পাম্পহাউজ পুনর্বাসন এবং খুলনার কয়রায় বাঁধ সংস্কার প্রকল্পের ক্ষেত্রে একটা হিসাব করতে পেরেছি। মোট টাকার অংক ছিল এক ১০২ কোটি টাকা, আমরা অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখতে পেয়েছি ২শ’ কোটি টাকার মতো। দুর্নীতির কারণে চারটি প্রকল্পে ক্ষতির পরিমাণ ১৯১ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবেলায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় একধরণের আত্মতুষ্টি আছে। এই আত্মতুষ্টির কারণে দুর্যোগ মোকাবেলায় দীর্ঘকালীন যে চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বিদ্যমান সেগুলো অবহেলা করা হয় এবং চ্যালেঞ্জসমূহ নিরসন করে আরো অগ্রগতির প্রয়াসে ঘাটতি দেখা যায়। তাই আমরা যদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরো উৎকর্ষ সাধন করতে পারি তাহলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জাতীয় আয়ের গড়ে ২.২ শতাংশ বার্ষিক যে বিশাল ক্ষতি হয় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।