শিরোনাম

হাদিসুরের শেষ বিদায়, এবং অতঃপর…

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২২ ৭:১৮ অপরাহ্ণ
Print Friendly and PDF
Spread the love

বাবা মাদসারা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার হাদিসুরের কবরে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। ‘বাবা ও বাবা, ও হাদিস বাবা একবার বুকে আয় বাবা। মোরে ওষুধ কিনে কে দিবে?’ এমন বুকফাটা আহাজারিতে আজ বিকেলে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। বাড়ি জুড়ে শোকের মাতম চলছে। পুরো এলাকা নিস্তব্ধ।

বাড়ির পূবপাশে সকাল ১০টায় জানাজা নামাজ সম্পন্ন হয়। এ সময় মানুষের ঢল নেমে আসে। জানাজার পূর্ব মুহূর্তে বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং সাবেক নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আলহাজ্ব এবিএম গোলাম কবির, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান, ডির্পাটমেন্ট শির্পিং এর নৌ-প্রকৌশলী তাইফুর আহমেদ, মেরিন একাডেমির কমান্ডিং আতিকুর রহমান, জিএম ক্যাপ্টেন আবু সুফিয়ান, বিআইডব্লিউটিআই এর প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন আলী রেজা এবং পরিবারের পক্ষ থেকে হাদিসুরের ছোটভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।

এ সময় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলেন,‘ প্রকৌশলী হাদিসুরের আমরা শোকাহত। সরকার ও আওয়ামী লীগে নেতৃবৃন্দ সবসময় হাদিসুরের পরিবারের পাশে থাকবে। এ সময় ১ লাখ টাকার চেক দিয়ে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেন।

হাদিসুর রহমান আরিফের জানাজায় জিএম ক্যাপ্টেন আবু সুফিয়ান বলেন, ‘২ মার্চ বিকেলে রকেট হামলায় নিহত হয়। ঘটনার কিছু সময় পূর্বে হাদিসুর রহমান আসরের নামাজ পড়ে। এরপর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলার জন্য জাহাজের উপরে চলে আসে। কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই রকেট হামলায় নিহত হয়।’

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জানাজা নামাজ শেষে তার লাশ দাদা আতাহার উদ্দিন হাওলাদার ও দাদি মোসা: রোকেয়া বেগমের কবরের দক্ষিণ পাশে দাফন করা হয়েছে। বাড়ির পূর্বপাশের মাঠে একটি অস্থায়ী মঞ্চে কফিন রেখে জানাজা সম্পন্ন করা হয়। জানাজা নামাজ পড়ান বেতাগী ছালেহিয়া সিনিয়র আলিম মাদরাসার সংলগ্ন জামে মসজিদের প্রেস ইমাম প্রভাষক মো: জিয়াউর রহমান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুহৃদ সালেহীন বলেন, ‘হাদিসুরের এমন মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। উপজেলা প্রশাসন এ পরিবারের জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।’

মা আমেনা বেগম জানান, হাদিসুর রহমান গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন। বাড়িতে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মাকে চিসিৎসা করান। সে সময় হাদিস বাবা-মাকে জানান, ঈদের আগেই বাড়িতে ঘর তোলা হবে এবং ঈদের পরেই বাবা-মায়ের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করবেন।

১৯৯৩ সালের ১৮ মে হাদিসুর জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি থেকে কৃতিত্বের সাথে পাস করার পর ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল জাহাজে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৮ সালে থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে যুক্ত হন।

হাদিসুর রহমান ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। জাহাজটি তুরস্ক থেকে রওনা হয়ে গত ২২ ফেবুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দর জলসীমায় নোঙর করে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে অলভিয়া বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। গত ২ মার্চ বিকেলে রকেট হামলায় হাদিসুর রহমান আরিফ নিহত হন।

জাহাজটি ২৯ জন নাবিক ও ক্রু নিয়ে সেখানেই নোঙর করা অবস্থায় আটকা পড়ে। গত ২ মার্চ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২৫ মিনিট ও ইউক্রেন সময় ৫টা ২৫ মিনিটে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে রকেট হামলা হয়। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। হামলায় জাহাজের ব্রিজ ধ্বংস হয়ে যায়। নিহত হন নাবিক হাদিসুর রহমান।

সিরামিকের কাঁচামাল ‘ক্লে’ পরিবহনের জন্য জাহাজটি তুরস্ক থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরের জলসীমায় পৌঁছায় এবং ২ মার্চ বুধবার রকেট হামলার শিকার হয়। শেষ মুহূর্তে বন্দরে পাইলট না পাওয়ায় ইউক্রেনের জলসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বাংলাদেশের এই জাহাজ। পরে জীবিত ২৮ নাবিককে ৩ মার্চ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে ইউক্রেনের একটি বাংকারে নেয়া হয়। সেখান থেকে তাদের নিরাপদে রোমানিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। ইউক্রেনের একটি বাংকারে ‘ফ্রিজআপ’ করে রাখা হয়েছিল হাদিসুরের লাশ।

বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের ২৮ নাবিক ইউক্রেন থেকে মলদোভা, রোমানিয়া হয়ে গত ৯ মার্চ দুপুরে দেশে ফেরেন। হাদিসুর রহমানের লাশ গত শুক্রবার ইউক্রেন থেকে মলদোভা হয়ে রোমানিয়ায় নেয়া হয়। এরপর তা ঢাকায় পাঠানো হয়। সোমবার (১৪ মার্চ) দুপুরে হাদিসুরের লাশ দেশে পৌঁছে।